ভারতীয় ভিসায় কড়াকড়ি : ইউরোপগামী হাজারও বাংলাদেশির স্বপ্নভঙ্গ
- আপলোড সময় : ৩১-০৮-২০২৫ ০৯:৪৬:৩৮ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ৩১-০৮-২০২৫ ০৯:৪৬:৩৮ পূর্বাহ্ন

সুনামকণ্ঠ ডেস্ক ::
ভারতের ডাবল-এন্ট্রি ভিসা না পাওয়ায় দিল্লিতে ইন্টারভিউ দিতে যেতে পারছেন না ইউরোপে যেতে ইচ্ছুক হাজারও বাংলাদেশি। এর মধ্যে ওয়ার্ক ভিসা ও স্টুডেন্ট ভিসার আবেদনকারীরা আছেন। ভারতের ভিসা না পাওয়ায় দিল্লিতে ইউরোপের যেসব দেশের দূতাবাস বাংলাদেশিদের ভিসা ইস্যু করে থাকে, সেখানে ইন্টারভিউ দিতে সময়মতো পৌঁছাতে পারছেন না ভিসা প্রার্থীরা। এতে ইউরোপগামী বাংলাদেশিদের ওয়ার্ক অর্ডার যেমন বাতিল হচ্ছে, তেমনি শিক্ষার্থীদেরও প্রত্যাশিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে পাওয়া ‘অফার লেটারের’ মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে।
এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী আকসিদুর গোলদার গণমাধ্যমকে জানান, গত ডিসেম্বরে রোমানিয়ার একটি কনস্ট্রাকশন কো¤পানির ওয়ার্ক অর্ডার পান তিনি। গত ১৯ জুন তিনি দিল্লিতে রোমানিয়া দূতাবাসে সাক্ষাৎকারের ডেট পান। কিন্তু ভারতের ভিসার জন্য আবেদন করলেও তাকে ভিসা দেওয়া হয়নি। ওয়ার্ক অর্ডারের মেয়াদ ৬ মাস অতিক্রম করেছে। নতুনভাবে ওয়ার্ক অর্ডারের মেয়াদ আরও ৬ মাস বাড়ানো হয়েছে। বর্ধিত মেয়াদেরও তিন মাস অতিবাহিত হয়ে গেছে। আকসিদুর গোলদার বলেন, সবকিছু এখনো অনিশ্চিত অবস্থায় আছে।
রোমানিয়া, পর্তুগালসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশ থেকে কয়েক হাজার ওয়ার্ক অর্ডার এসেছে বাংলাদেশিদের জন্য। এসব ওয়ার্ক অর্ডারের বিপরীতে দিল্লিতে ওই সব দূতাবাস থেকে ইন্টারভিউ ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়ার জন্য সময় দিয়েছে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের আগে দিল্লি যাওয়ার ভিসা না পাওয়ায় এসব দূতাবাসে ইন্টারভিউ এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে যেতে পারছেন না ভুক্তভোগীরা।
শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও ঘটছে একই ঘটনা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লাখ লাখ টাকা টিউশন ফি দিয়েও ভিসা জটিলতায় তারা শিক্ষা সেশন ধরতে পারছেন না। ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনে দিল্লি যাওয়ার জন্য ডাবল-এন্ট্রি ভিসার আবেদন করেও সময়মতো ভিসা পাচ্ছেন না অনেকেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিকারকদের একজন জানান, তিনি প্রায় ৪০ লাখ টাকা খরচ করেছেন রোমানিয়ার ওয়ার্ক অর্ডারের জন্য। তার কাজের অগ্রগতিও ভালো। কিন্তু দিল্লি যাওয়ার ভিসা না পাওয়ায় একের পর এক ইন্টারভিউ ডেট মিস করছেন ভিসা প্রার্থীরা। তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন জায়গায় দেনদরবার করেও ভারতের ভিসা পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি জানান, এভাবে রোমানিয়াগামী প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার বাংলাদেশির জন্য জোগাড় করা ওয়ার্ক অর্ডারের মেয়াদ শেষে হয়ে যাওয়ার পথে। এতে সার্বিকভাবে বহির্বিশ্বে আমাদের সুনাম ক্ষুণœ হচ্ছে।
বাংলাদেশিরা রোমানিয়ার ভিসা না করতে পারলেও নেপাল ও ভারতের শিক্ষার্থী ও কর্মীরা বিপুল সংখ্যায় ভিসা পাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার দৌড়ে বাংলাদেশিরা পিছিয়ে পড়ছেন। তিনি আরও বলেন, আমরা যারা জনশক্তি ব্যবসায়ী, তাদের কোটি কোটি টাকা আটকে আছে ইউরোপে কর্মী পাঠানোর কাজে। এসব কর্মী দিল্লি যাওয়ার ভিসা না পাওয়ায় দিল্লি থেকে যেসব ভিসা নেবেন, সেই দেশগুলোর দূতাবাসে গিয়ে ইন্টারভিউ দিতে পারছেন না। কিন্তু এভাবে সময় চলে গেলে তাদের ওয়ার্ক অর্ডার বাতিল হয়ে যাবে এবং আমরা লোকসানে পড়ব।
দিল্লি যাওয়ার ভিসা না পাওয়া স¤পর্কে ভারতীয় দূতাবাসের এক কর্মকর্তা জানান, গত বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে ডাবল-এন্ট্রি ভিসা দেওয়া বন্ধ আছে। খুবই সীমিত আকারে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে এই ভিসা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ডাবল-এন্ট্রি ভিসার ক্ষেত্রে ভুয়া কাগজপত্র জমা দেওয়ার কারণে এই ভিসা প্রক্রিয়াতে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। ভুয়া কাগজপত্র জমা দেওয়ার কারণে ভবিষ্যতে বাংলাদেশিদের ভিসা পেতে আরও সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসায় কড়াকড়ি আরোপ করায় বিপাকে পড়েন ইউরোপগামী চাকরিপ্রার্থী ও শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ওয়ার্ক ভিসা ও স্টুডেন্ট ভিসা পেতে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বাংলাদেশিরা। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দিল্লির বিকল্প হিসেবে তৃতীয় কোনো দেশ থেকে ভিসা প্রাপ্তি বা দিল্লি থেকে ঢাকায় ভিসা সেন্টার স্থানান্তরের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু এ বিষয়ে ইউরোপের সংশ্লিষ্ট দেশগুলো থেকে তেমন সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
সূত্র জানায়, ঢাকায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রায় সব ইইউভুক্ত দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিন্তু তাতে তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে দিল্লিতে ইইউভুক্ত যেসব দেশের দূতাবাস রয়েছে, তাদের সঙ্গে বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করেছেন দিল্লিতে অবস্থিত বাংলাদেশের হাইকমিশনার ও কর্মকর্তারা। এতেও ইইউ রাষ্ট্রদূতদের কাছ থেকে উল্লেখ করার মতো সাড়া মেলেনি। এ ছাড়া বাংলাদেশ মিশনের মাধ্যমে ভিয়েনা থেকেও ইইউভুক্ত বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে, যাতে বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে দিল্লির বিকল্প উপায় বের করা যায়। তাতেও ওই সব দেশের নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি বা পাওয়ার সম্ভাবনাও অত্যন্ত ক্ষীণ।
এই সমস্যার মূল কারণ, বাংলাদেশে নতুন করে কোনো দেশের ভিসা অফিস খোলা ব্যয়সাপেক্ষ ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। কাজেই ওই দেশগুলো নতুন বা বিকল্প ভিসা অফিস খুলতে আগ্রহী হচ্ছে না।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইউরোপ ডেস্কের মহাপরিচালক মোশারফ হোসেন জানান, ভারতের ভিসা না পেয়ে ইউরোপের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তি হতে পারছেন না, এমন অনেক শিক্ষার্থী আমাদের কাছে সহায়তা চেয়ে আবেদন করেছেন। আমরা ওই শিক্ষার্থীদের ভিসার আবেদন বিবেচনা করার জন্য ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনে অনুরোধ জানিয়েছি। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি ইউরোপগামী শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করতে। এর বাইরেও অনেক শিক্ষার্থী রয়েছেন, যারা ভারতের ভিসা পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা জটিল করার পর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দিল্লিতে এবং ঢাকায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত এবং হাইকমিশনারদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি দিল্লি থেকে ভিসা সেন্টার ঢাকায় স্থানান্তর করতে ইউরোপের রাষ্ট্রদূতদের প্রতি আহ্বান জানান। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের ভিসা প্রক্রিয়াকরণ সংস্থা ভিএফএস গ্লোবালের সঙ্গেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে কথা বলা হয়েছে যাতে বাংলাদেশিদের পাসপোর্ট দিল্লিতে নিয়ে গিয়ে ভিসা প্রক্রিয়ার কাজটি করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, এ বিষয়ে এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি। -খবরের কাগজ
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ